📖 আনটোল্ড স্টোরি

শিক্ষকের চক-ডাস্টার থেকে
চায়ের কেতলি — এক অদম্য যাত্রা

আসসালামু আলাইকুম। আমি মোঃ সহিদুল ইসলাম। আজ মানুষ আমাকে দেশজুড়ে পরিচিত চেইন শপ 'MA Pass Cha Wala'-র ফাউন্ডার হিসেবে চিনে। আজ যখন মানুষ আমাদের আউটলেটের জমজমাট আলো, কাস্টমারদের ভিড় আর সফলতার বিলবোর্ড দেখে, তখন হয়তো তারা ভাবেন—এই পথচলাটা খুব সহজ ছিল।

কিন্তু এই হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বুক চাপা কান্না, নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার হাহাকার আর অবশ শরীর নিয়ে বেঁচে থাকার এক অদৃশ্য ও নির্মম লড়াইয়ের গল্প।

০১

ছকবাঁধা জীবন, হঠাৎ ঝড়

করোনা প্যান্ডেমিকের আগের জীবনটা ছিল ছকবাঁধা এবং শান্ত। আমি ছিলাম মনপুরা স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষক। ক্লাসরুমে ব্ল্যাকবোর্ডে চক-ডাস্টারের শব্দ আর শিক্ষার্থীদের কোলাহলেই কেটে যেত আমার দিন। কিন্তু ২০২০ সালের সেই বৈশ্বিক মহামারী আমার সাজানো জীবনটাকে এক নিমেষে ওলটপালট করে দিল। হঠাৎ করেই চলে গেল আমার শিক্ষকতার চাকরিটি। মধ্যবিত্তের সংসার নিয়ে আমি অথই সাগরে পড়লাম।

০২

শেষ সম্বল, প্রথম প্রতারণা

করোনা পরবর্তী সময়ে নতুন কিছু করার তাগিদে, বুকে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে আমার গ্রামের বাড়ির শেষ সম্বল—জমিটুকু বিক্রি করে দিলাম। সেই টাকা দিয়ে শুরু করলাম 'অর্ক' নামে একটি ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম। ভেবেছিলাম প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার আলো ছড়াবো।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! কিছু অসাধু ওয়েবসাইট ডেভেলপার এবং ডিজিটাল মার্কেটারের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে আমার জীবনের সব পুঁজি হারিয়ে ফেলি। বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে আমি রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে গেলাম।

০৩

জীবনের অন্ধকারতম অধ্যায়

সব পুঁজি হারিয়ে যখন আমি শূন্য হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেলাম, চারদিকের তীব্র মানসিক চাপ আর পাওনাদারদের গ্লানি আমার শরীর আর সহ্য করতে পারল না। জীবনের সেই অন্ধকারতম মুহূর্তে আমি এমন এক সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম, যেখান থেকে ফিরে আসা যায় না। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি সেই মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসি।

এরপর তীব্র পেরেশানিতে আমি এক ধাক্কায় দুই দুইবার মারাত্মক ব্রেন স্ট্রোক করি। নিয়তি আমাকে শুধু নিঃস্বই করেনি, আমার শরীরটাকেও অবশ করে দিল। আমি সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে গেলাম।

যে মানুষটা কিছুদিন আগেও ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে শত শত ছাত্র পড়াতো, সে আজ নিজের হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে!

চারদিকের অন্ধকার তখন আরও ঘনীভূত হচ্ছিল। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত আর কৃপায় আমি বেঁচে যাই। প্যারালাইসিসের অবশ অনুভূতিকে জয় করে, লড়াই করে যখন আমি আবার উঠে দাঁড়ালাম, তখন আমি সম্পূর্ণ নতুন এক সহিদুল ইসলাম। আল্লাহ হয়তো আমার হাত দিয়ে অন্য কোনো বড় ইতিহাস লেখাতে চেয়েছিলেন।

০৪

দেয়ালে পিঠ, শূন্য পকেট

মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরার পর ভাবলাম এখন কী করা যায়। শূন্য পকেটে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে প্রতিদিন হতাশ হয়ে ঢাকার এক অলিগলি থেকে অন্য অলিগলিতে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতাম। তখন একটা দিন পার হওয়া মনে হতো ছয়টা মাসের সমান দীর্ঘ।

সংসার বাঁচাতে প্রথমে চিন্তা করলাম একটা অটো রিকশা চালাবো। কিন্তু তখনই জানতে পারলাম ঢাকার মেইন রোডে অটো রিকশা চালানো নিষিদ্ধ। সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে গেল। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কাকে বলে, আমি তখন প্রতি সেকেন্ডে টের পাচ্ছিলাম।

০৫

এক কাপ চায়ের আইডিয়া

হতাশার চাদর ভেঙে একদিন ঠান্ডা মাথায় ভাবলাম, এই বিশাল শহরের মানুষ সবচেয়ে বেশি কী পছন্দ করে? খেয়াল করলাম, বাংলাদেশে পানির পরেই মানুষ সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি পান করে, তা হলো এক কাপ গরম চা। ধনী-দরিদ্র, ছাত্র-শিক্ষক—সবার আড্ডার প্রাণ এই চা। একরকম চিন্তা করেই ফেললাম, আমি চায়ের দোকান দেবো।

০৬

"এত পড়াশোনা করে চায়ের দোকান?!"

অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা ছোট দোকান পেয়ে গেলাম। কিন্তু এবার বিপত্তি বাধলো দোকানের নাম নিয়ে। বন্ধুদের যখন বললাম চায়ের দোকান দিবো, তারা হোহো করে হেসে উঠলো। উপহাস করে বলল, "তোর কি মাথা নষ্ট হয়ে গেছে? এত পড়াশোনা করে শেষমেষ চায়ের দোকান করবি?"

আমাদের সমাজের এই এক অদ্ভুত কুসংস্কার—পড়াশোনা করলেই নাকি শুধু বড় চাকরি করতে হবে, কোনো স্বাধীন কাজ বা ছোট ব্যবসা করা যাবে না! সমাজের এই কুৎসিত ট্যাবুকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জেদ চাপলো আমার মাথায়। বুক ফুলিয়ে দোকানের নাম দিলাম:

"MA Pass Cha Wala"

এম এ পাস চা ওয়ালা

বিলবোর্ডে যখন বড় বড় অক্ষরে নামটা ঝুলল, চারপাশের মানুষ অবাক হয়ে গেল। অনেকে আড়ালে হাসাহাসি ও সামনাসামনি কটূক্তি করা শুরু করল। কিন্তু আমি ততদিনে জীবনের এমন এক রূপ দেখে এসেছি, যেখানে মানুষের নিন্দার চেয়ে পরিবারের মুখে ভাত তুলে দেওয়াটা অনেক বেশি পবিত্র। লোকের নিন্দায় কান না দিয়ে, চায়ের কেতলি হাতে আমি দুর্বার গতিতে এগিয়ে গেলাম।

০৭

আলহামদুলিল্লাহ্ — আজকের দিন

আজ পেছনে ফিরে তাকালে চোখ ভিজে আসে কৃতজ্ঞতায়। এই চা বিক্রি করে আজ আমি শুধু নিজের সংসারই চালাইনি, আমার অধীনে আরও বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছি।

আজ যখন আমার আউটলেটের স্টাফরা মাস শেষে হাসিমুখে বেতন নিয়ে বাড়ি ফেরে, তখন যে আত্মতৃপ্তি লাগে, তা কোটি টাকা দিয়েও কেনা সম্ভব না।

"এম এ পাস চা ওয়ালা" আজ আর কেবল একটা দোকান বা ব্র্যান্ড নয়; এটি এখন আমার ধমনীতে, আমার রক্তের সাথে মিশে গেছে। আমার যত স্বপ্ন, কল্পনা, পরিকল্পনা—সবকিছুই এখন এই ব্র্যান্ডকে ঘিরে।

এখন আমি একা নই, আমি চাই আমার এই সফলতার গল্পে আপনারা অনেকেই অংশীদার হোন। পৃথিবীতে ব্যবসার আইডিয়া অনেক আছে, কিন্তু আপনাকে এমন একটি ব্যবসা করতে হবে যা একেবারে রিস্ক-ফ্রি এবং মানুষের প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয়। আর সেই চলমান ব্যবসাটি হলো চায়ের শপ।

আপনার পালা

লোকলজ্জার ভয় ঝেড়ে ফেলে
আজই শুরু করুন

চাকরির পেছনে ছুটে ক্লান্ত? আমাদের কাছ থেকে সঠিক গাইডলাইন ও কোর্স করে আপনিও আপনার এলাকায় শুরু করতে পারেন চায়ের বিজনেস। ২০+ আইটেম রেসিপি, ১০টি কমপ্লিট বিজনেস গাইডলাইন — সব এক কোর্সে।

"কাজের কোনো ছোট-বড় নেই, স্বাবলম্বী হওয়ার চেয়ে বড় কোনো ডিগ্রি এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই!"